মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার দুর্গম আলোকদিয়া চরে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও একাধিক অভিযানের পরও থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন এবং জনবসতির একেবারে পাশে বসানো হয়েছে প্রায় ৯টি অবৈধ ড্রেজার। এসব ড্রেজারের মাধ্যমে প্রতিদিন বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করে শতাধিক বাল্কহেডে লোড-আনলোড করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট ২০২৬) আলোকদিয়া চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে জনবসতি ঘেঁষে একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাল্কহেডে বালু বোঝাই ও খালাসের কার্যক্রমও চলছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রভাব খাটিয়ে নির্বিঘ্নে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। গত ২২ আগস্ট বসতবাড়ি ও জমি রক্ষায় স্থানীয়রা একটি অবৈধ ড্রেজারে হামলার চেষ্টা করলে কথিত শাহআলম বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র প্রদর্শন করে এলাকাবাসীকে ভয়ভীতি দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অব্যাহত বালু উত্তোলনের কারণে বসতভিটা, ফসলি জমি এবং নদীতীরবর্তী জনপদ ভাঙনের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে এলাকাবাসী এরই মধ্যে একাধিকবার মানববন্ধন করেছে এবং জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। এমনকি বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরে আনার দাবিতেও কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, একের পর এক অভিযোগ ও প্রশাসনিক অভিযানের পরও মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়ায় বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগের তীর বিশেষভাবে নৌপুলিশের ভূমিকার দিকে। তাদের দাবি, উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালালেও নৌপুলিশের নিয়মিত ও কার্যকর তৎপরতা না থাকায় অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই আবারও শুরু হয় অবৈধ বালু উত্তোলন। ফলে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে নৌপুলিশের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এ বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা রানী কর্মকার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে অভিযানের খবর আগেই সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় অনেক সময় ঘটনাস্থলে গিয়ে ড্রেজার না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বারবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা সম্ভব নয়। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নৌপুলিশকে নিয়মিত টহল জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ইউএনওর বক্তব্যের পরও স্থানীয়দের প্রশ্ন—অভিযানের খবর যদি বারবার আগেই অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে প্রশাসনের গোপন অভিযান পরিকল্পনা ফাঁস হচ্ছে কোথা থেকে? আর নৌপুলিশের নিয়মিত টহল থাকার কথা থাকলেও দিনের পর দিন কীভাবে জাতীয় গ্রিডের টাওয়ার ও জনবসতির পাশে একাধিক ড্রেজার প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করে?
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু ড্রেজার জব্দ বা মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল হোতা, অর্থের জোগানদাতা, ড্রেজার মালিক ও কথিত সশস্ত্র পাহারাদারদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায় প্রশাসনের চোখের সামনে দিনের পর দিন চলতে থাকা এই অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু নদী ও পরিবেশের জন্য নয়, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়, অভিযোগের পর অভিযোগ এবং প্রকাশ্য তৎপরতার পরও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বালু মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় কি না।












