মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম আলোকদিয়ার চর এলাকায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার সংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এলাকাটি যেন বালু দস্যু ও বালু মাফিয়াদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,গত ৫ জুন ২০২৬ থেকে যমুনা নদীর তীরবর্তী জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় ৬ থেকে ৭টি অবৈধ সেকশন-কাটার মেশিন বসিয়ে প্রতিদিন শতাধিক বাল্কহেডে বালু লোড-আনলোড করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম একটি প্রভাবশালী চক্র সশস্ত্র পাহারায় পরিচালনা করছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বহিরাগত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে এনে এলাকাজুড়ে ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না।
সরেজমিনে ড্রেজার, আতঙ্কে স্থানীয়রা
২৪ জুন ২০২৬ তারিখে সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে যমুনা নদীর ওই এলাকায় অন্তত ৫ থেকে ৬টি ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীদের বহনকারী ট্রলারের চালক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিক পরিচয় প্রকাশ পেলে জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এছাড়া ঘটনাস্থলের আশপাশে একটি সেলো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ৭ থেকে ৮ জন যুবককে সন্দেহজনকভাবে টহল দিতে দেখা যায়। ট্রলারচালকের দাবি, তারা অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের হয়ে পাহারার দায়িত্ব পালন করছে।
প্রশাসনের নির্দেশ,কিন্তু কার্যকর অভিযান কোথায়?জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা গণমাধ্যমকে জানান, অভিযোগের বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর অভিযান পরিচালিত হয়নি।এছাড়া গত ২০ জুন ২০২৬ তারিখে স্থানীয়রা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি তাদের।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ একাধিক স্থানীয় সূত্রের দাবি,একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় থেকে সংশ্লিষ্ট চক্রটি অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ কারণেই প্রশাসনের কিছু অংশ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংগঠনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনা নদীতে নিয়মিত নৌ টহল থাকার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন চললেও তা বন্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনবসতিপূর্ণ এলাকা, কৃষিজমি, নদীতীর, সেতু, বাঁধ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিকটবর্তী এলাকায় অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলন বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আইনের বিভিন্ন ধারায় উল্লেখ রয়েছে—
অনুমোদিত বালুমহালের বাইরে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। ড্রেজার বা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন দণ্ডনীয় অপরাধ।
নদীর তীর, জনবসতি, ফসলি জমি, সড়ক, সেতু, বাঁধ, রেললাইন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে বালু উত্তোলন আইনত নিষিদ্ধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে জড়িত ব্যক্তিদের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, ড্রেজার ও যন্ত্রপাতি জব্দ এবং অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে এ ধরনের অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙন, ভূমিধস, ফসলি জমির ক্ষতি, জনবসতির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের দাবি আলোকদিয়ার চর এলাকার বাসিন্দারা অবিলম্বে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনা, ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ, অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও জনবসতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য,প্রশাসন এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে যমুনা নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়বে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও হুমকির সম্মুখীন হবে।”











