যমুনার বুকে নৌযান চলাচল যেন এখন আতঙ্কের আরেক নাম। ঢাকা-সিরাজগঞ্জ নৌরুটে চলাচলকারী বাল্কহেড ও অন্যান্য নৌযানে অস্ত্রের মুখে চাঁদাবাজি, হামলা, জিম্মি ও ডাকাতির অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয় নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন আঃ সালাম। স্থানীয়দের কাছে কথিত এই চক্রটি ‘সালাম বাহিনী’ নামে পরিচিত।অভিযোগ রয়েছে,বেলকুচি,চৌহালি ও টাঙ্গাইল সদর উপজেলার যমুনা-সংলগ্ন বিস্তীর্ণ নৌপথে দীর্ঘদিন ধরেই সালাম ও তার সহযোগীদের তৎপরতায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চল ও নৌপথকে ব্যবহার করে নৌযান থামিয়ে চাঁদা দাবি এবং অস্ত্রের ভয় দেখানোর অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।বাল্কহেড থামিয়ে চাঁদা দাবি, রড দিয়ে হামলার অভিযোগ সর্বশেষ টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া-কলাবাগান এলাকায় ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জগামী একটি বালুবাহী বাল্কহেডে হামলার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য,আঃ সালামের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি নৌযানটি থামিয়ে অস্ত্রের মুখে শুকানি রুহুল আমিন ও রানা এবং নৌযানে থাকা শ্রমিকদের জিম্মি করে। এ সময় তাদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কথিত সন্ত্রাসীরা আচমকা লোহার রড দিয়ে রুহুল আমিন ও রানাকে মারধর করে গুরুতর আহত করে বলে অভিযোগ। পরে তাদের সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সাও ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।হামলায় আহত রুহুল আমিন ও রানার চিকিৎসা এবং ঘটনার বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও মামলার নথি প্রকাশ্যে এলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। যমুনার বিস্তীর্ণ এলাকায় আতঙ্ক ৯ আগস্ট ২০২৬ সরেজমিনে কাকুয়া, কলাবাগান, চর পুংলি, পানা কুড়া, গোয়ালা হোসেন, আর গোয়ালা, দিপু গোয়ালা, কান্দাপাড়া, বেলকুচির মেহেরনগর চর, বেলখিদ্রচাপড়ি, রান্ধানপুর, বারবালা, সেটেল ও চরমহেশপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানের সময় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা হয়।
ঢাকা-সিরাজগঞ্জ নৌরুটে চলাচলকারী নৌযানের মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমানে যমুনার এসব নৌপথে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।তাদের ভাষ্য, কখন কোন নৌযানকে অস্ত্রের মুখে থামানো হবে, কখন চাঁদা দাবি করা হবে কিংবা কাউকে জিম্মি করা হবে—তা নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, “যমুনায় সালামের নাম এখন আতঙ্কের নাম।”তাদের প্রশ্ন—এত অভিযোগের পরও কথিত এই বাহিনী কীভাবে সক্রিয় থাকে? ‘আমি ভয়ংকর জলদস্যু ছিলাম’—সালামের নিজের মুখেই অতীতের কথা সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সালাম বাহিনীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আঃ সালামের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।দুই দিন ধরে একাধিকবার ফোন করার পর একপর্যায়ে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন এবং নিজের অতীত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন।
সালামের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় তিনি নৌপথের ভয়ংকর অপরাধী ও জলদস্যু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার সঙ্গে অস্ত্রধারীরা থাকত এবং তারা তাকে পাহারা দিত। তিনি নৌপথে নামলে নদীপথে আতঙ্ক তৈরি হতো।তার এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়, ‘সালাম বাহিনী’ নামটির সঙ্গে তার অতীতের নৌপথকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের একটি যোগসূত্র ছিল—এমনটাই তিনি নিজ বক্তব্যে তুলে ধরেছেন।তবে সালামের দাবি, বর্তমানে তিনি আর কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন। তার ভাষ্য, বর্তমানে তার চারটি ড্রেজার রয়েছে এবং ব্যবসায়িক কাজের কারণেই মাঝে মাঝে নদীপথে যেতে হয়। অতীতের জলদস্যু থেকে চার ড্রেজারের মালিক—প্রশ্ন উঠছে এখানেই সালামের নিজের বক্তব্যই এখন সামনে আনছে একাধিক প্রশ্ন।যে ব্যক্তি নিজেই বলছেন, একসময় অস্ত্রধারীদের পাহারায় নৌপথে চলতেন এবং তার উপস্থিতিতে নদীপথে আতঙ্ক তৈরি হতো—তিনি কীভাবে এত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে বর্তমানে চারটি ড্রেজারে ও ৬ টি ভেকু মেশিন এর মালিক হলেন? তার ব্যবসায়িক উত্থান,সম্পদের উৎস এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমান কোনো যোগাযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কখনও বিস্তারিত অনুসন্ধান হয়েছে কি না, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।অবশ্য অতীতে অপরাধে জড়িত থাকার দাবি থাকলেই কোনো ব্যক্তিকে বর্তমানে অপরাধী বলা যায় না।
একইভাবে স্থানীয়দের অভিযোগও তদন্ত ছাড়া প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। কিন্তু বর্তমানে যদি সত্যিই একই নাম ব্যবহার করে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র যমুনায় নৌযান থামিয়ে চাঁদাবাজি ও হামলা চালিয়ে থাকে, তাহলে সেই চক্রের সঙ্গে সালামের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা তদন্ত করে দেখা জরুরি। সালামের কথিত সহযোগীদের নিয়েও অভিযোগ,স্থানীয়দের অভিযোগে সালামের কথিত বাহিনীর সদস্য হিসেবে মাসুদ, কাওছার আলম, কাওছার, বাপ্পি, রুজবেল ও হাবিবসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। এমপি টুকু:অপরাধীদের শিকড় থেকে তুলে ফেলবো’নৌপথে কথিত সালাম বাহিনীর তৎপরতার অভিযোগের বিষয়ে টাঙ্গাইল-৫ আসনের সংসদ সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন আহমেদ টুকুর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, তিনি আগে বিষয়টি শোনেননি। গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেবেন। তিনি আরও বলেন, তার নির্বাচিত এলাকায় কাউকে কোনো ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না এবং অপরাধীদের “শিকড় থেকে তুলে ফেলা হবে।”
তাহলে যমুনায় ‘সালাম বাহিনী’র খুঁটির জোর কোথায়? অতীতের নৌপথের ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে নিজের পরিচয়ের কথা সালাম নিজেই বলেছেন। বর্তমানে তিনি অপরাধে জড়িত নন—এমন দাবিও করেছেন। কিন্তু একই সময়ে যমুনার নৌপথে নতুন করে অস্ত্রের মুখে চাঁদাবাজি, হামলা ও জিম্মির অভিযোগ উঠছে। স্থানীয় নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা আতঙ্কের কথা বলছেন। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—পুরোনো‘সালাম বাহিনী’ কি সত্যিই বিলুপ্ত?নাকি সেই বাহিনীর কোনো অংশ এখনও যমুনার বুকে সক্রিয়? নৌযানে হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত?অস্ত্রধারীদের পেছনে কারা রয়েছে?আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যমুনার বুকে কথিত সালাম বাহিনীর এত দাপটের পেছনে ‘খুঁটির জোর’ কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর এখন স্থানীয়দের নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেই প্রত্যাশা করছে যমুনার নৌপথে চলাচলকারী নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা। অভিযোগ সত্য হলে দ্রুত অভিযান চালিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা—দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ। কারণ যমুনা কোনো ব্যক্তি বা বাহিনীর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের জায়গা নয়; নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।












