টানা অতি ভারী বৃষ্টিতে চুয়াডাঙ্গার শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য সড়ক ও শত শত হেক্টর কৃষিজমি। এতে একদিকে যেমন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে গ্রামীণ সড়ক ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া জানিয়েছে, শুক্রবার জেলায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি মরসুমে এটিই জেলায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। স্থানীয় সূত্র ও কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টানা বৃষ্টির কারণে জেলার অধিকাংশ এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে ফসলি মাঠে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে যাওয়ায় আমন বীজতলা, শাকসবজি ও অনান্য আবাদি ফসল পুরোপুরি তলিয়ে গেছে।
অনেক পুকুর ও ঘেরের মাছ পানির স্রোতে ভেসে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মাঠের চিত্র নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে চুয়াডাঙ্গার কৃষকরা জানান, ‘রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে মাঠের সব জমি পানির নিচে। পানি দ্রুত না নামলে এবার বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে। অনেক কষ্ট আর ধারদেনা করে ফসল আবাদ করেছি। আরেক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবজি ক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে রয়েছে। এলাকায় সঠিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর আমাদের এমন মরণফাঁদে পড়তে হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো থাকলে ক্ষতি কিছুটা কম হতো।’ এদিকে, ভারী বর্ষণে গ্রামীণ অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর কাঠালতলা থেকে কুমারীদহ গ্রামে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির একটি বড় অংশ ভেঙে পানির তোড়ে তলিয়ে গেছে। এতে ওই অঞ্চলের হাজারো মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, , এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে।
রাস্তাটি ধসে যাওয়ায় এখন চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এটি দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। অন্যদিকে, টানা বৃষ্টিতে মাথাভাঙ্গা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দামুড়হুদা উপজেলার হাতিভাঙ্গা গ্রামের পশ্চিমপাড়া এলাকায় নদীতীরের কয়েকটি বাড়িঘর তীব্র ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা অসিম বলেন, ‘নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে তীরের বাড়িগুলো যেকোনো সময় বিলীন হয়ে যেতে পারে। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি।’ শহরাঞ্চলের চিত্রও ছিল ভয়াবহ। ভোর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে শহরের প্রধান প্রধান সড়কসহ নিচু এলাকার বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। ফলে বাসিন্দারা কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েন। তবে দুপুর ২টার পর আকাশ কিছুটা মেঘমুক্ত হলে এবং বৃষ্টি থামলে শহরের জমে থাকা পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে। যদিও অনেক নিচু এলাকায় রাত পর্যন্ত জলাবদ্ধতা দূর হয়নি। ভারী বর্ষণের ফলে জেলার সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, মৎস্য বিভাগ বা পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইনচার্জ) জামিনুর রহমান বলেন, শুক্রবার চুয়াডাঙ্গা জেলায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আওতাভুক্ত। মরসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও জেলার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ একদিনের অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ২৭ পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন ও সদর উপজেলা প্রশাসন। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১০ জানুয়ারি ভোর ৪টা থেকে চুয়াডাঙ্গায় প্রচন্ড বৃষ্টিপাত হয়। অতিমাত্রার এ বৃষ্টিতে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের ভিমরুল্লাহ এলাকার ২৭ টি পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন ও সদর উপজেলা প্রশাসনের সরে জমিন পর্যবেক্ষণে জানা যায় ২৭ পরিবারের ১১৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত সকল পরিবারের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ প্যাকেট করে রান্না করা শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া প্রত্যেক পরিবারের জন্য ৫০ কেজি চাউল, ৫ কেজি ডাল, ৫ কেজি তেল, ৫ কেজি চিনি, ৫০০ গ্রাম ঝালের গুড়া, ৫০০ গ্রাম ধনীয়ার গুড়া, ৫০০ গ্রাম হলুদের গুড়া ও ৫ কেজি লবণ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রত্যেক পরিবারের কাছে এ শুকনো খাবার ও খাদ্য উপাদান সরবরাহ করেন চুয়াডাঙ্গা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নয়ন কুমার রাজবংশী ও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিথি মিত্র। দর্শনা অফিস জানিয়েছে, শুক্রবার ভোর রাত থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে দর্শনা পৌর শহরের বিভিন্ন মহল্লায় জলবদ্ধার সৃস্টি হয়েছে। সরকারি বেশ কয়েকটি অফিসে যেমন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছে, তেমনি পানি বন্দি রয়েছে বহু পরিবার। দর্শনা পৌর এলাকার আজমপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামপুর, পরাণপুর, দক্ষিণচাঁদপুর, ঘুঘুডাঙ্গা, ঈশ্বরচন্দ্রপুর, কেরুজ মিলপাড়া, স্কুলপাড়া, হাসপাতালপাড়া ও হঠাৎপাড়ায় জলবদ্ধতার কারণে বহু পরিবার ঘর বন্দি রয়েছে। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃস্টি হলেই জলবদ্ধতার কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় পৌরবাসিকে। এ দিকে জলবদ্ধতার কারণে কেরুজ ডিস্টিলারীতে উৎপাদন কার্যক্রম ছিলো বন্ধ। ডিস্টিলারী গোডাউন ও কারখানায় পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি হলেও পরিমান জানা যায়নি। তবে পানি নিষ্কাসনের ব্যবস্থা না থাকায় ডিস্টিলারী বিভাগ প্রায় দেড় ফুট পানির তলে রয়েছে। আজ শনিবার উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে বলেও অনিশ্চিত। এ ছাড়া জলবদ্ধায় কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছে দর্শনা জয়নগর চেকপোস্টের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস। ফলে ভোগান্তি পড়তে হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত যাতায়াতকারী যাত্রী সাধারণকে। অন্যদিকে দর্শনা ফুড গোডাউনে জলবদ্ধার সৃস্টি হওয়ায় কার্যক্রম ছিলো অস্বাভাবিক। দামুড়হুদা অফিস জানিয়েছে, টানা প্রবল বর্ষনে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার হাউলি ইউনিয়নের জয়রামপুর কাঁঠালতলা থেকে কুমারীদহ গ্রামে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কের একটি অংশ ভেঙে গেছে। এতে জয়রামপুর ও কুমারীদহ গ্রামের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ভোর রাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণের ফলে কাঁঠালতলা মসজিদেও পেছনের সড়কের নিচের মাটি সরে যায়। একপর্যায়ে প্রায় ১৫ ফুট অংশ ধসে যায়। ফলে জয়রামপুর ও কুমারীদহ গ্রামের একমাত্র যোগাযোগ সড়কটি যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।কুমারীদহ গ্রামের বাসিন্দা মসলেম আলী (৫৪) বলেন, রাত ৩টার দিকে শুরু হওয়া বৃষ্টির কারণে সকালে উঠে দেখি রাস্তার বড় একটি অংশ ভেঙে গেছে। এখন আমাদের অনেক ঘুরে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে। স্থানীয় দোকানদার কালু শেখ (৩৫) বলেন, এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ চলাচল করেন। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছে। দ্রুত সংস্কার না হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। ওই এলাকার বাসিন্দা আরিফুর ইসলাম মিলন বলেন, এটি জয়রামপুর ও কুমারীদহ গ্রামের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক।
ভারি বৃষ্টির কারণে রাস্তার বড় অংশ ভেঙে গেছে। দ্রুত সংস্কার না করলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। হাউলি ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দীন বলেন, সড়ক ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছি। রাস্তাটি আগে থেকে ঝুকিতে ছিল প্রবল বৃষ্টিতে ভেঙেগেছে। ইতিমধ্যে রাস্তাটি মেরামতের জন্য প্রকল্প দেয়া হয়েছে। তবে বৃষ্টিতে ভেঙ্গে একেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত ভাঙা অংশ মেরামত করে আপাতত চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাতে এলাকাবাসীর চলাচল স্বাভাবিক করা যায়। এদিকে সড়কটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, প্রতি বর্ষা মরসুমেই সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের ঝুঁকি দেখা দিলেও স্থায়ী কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভাঙনের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেয়ে আশপাশের এলাকাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। উপজেলা প্রকৌশলী খালিদ হাসান বলেন, সড়কটি ভেঙ্গে গেছে সকালেই জানতে পেরেছি দ্রুত রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। দামুড়হুদা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টিপাতে দামুড়হুদা টু কার্পাসডাঙ্গা ভায়া আঞ্চলিক সড়কের বামপাশে চিৎলা-গোবিন্দহুদা ছটাংগার মাঠ নামক স্থান থেকে ভূমি ধ্বস হয়েছে। এরফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেঙে পড়ছে পাকা সড়ক। ওই এলাকায় প্রায় ২০ বিঘা জমি থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু মাটি উত্তোলনের ফলে আশপাশের কৃষিজমি ও গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। গতকালের টানা ভারী বর্ষণে খননকৃত এলাকায় ব্যাপক ধ্বস নেমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চুয়াডাঙ্গা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী। স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী শাসনামলে দামুড়হুদা উপজেলার চিৎলা-গোবিন্দহুদা ঈদগাহ সংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশের প্রায় ২০ বিঘারও বেশি জমি থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করা হয়েছে। এতে আশপাশের একাধিক মাঠে যাতায়াতের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কার্পাসডাঙ্গা-দামুড়হুদা আঞ্চলিক মহাসড়কের একাধিক স্থানে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, টানা বর্ষণের কারণে খননকৃত স্থানে মাটি ধ্বসে পড়ে পাশের কৃষিজমি তলিয়ে যাচ্ছে। মহাসড়কের একেবারে পাশ পর্যন্ত ভাঙনের ফলে যে কোনো সময় সড়কের বড় অংশ ধসে পড়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এদিকে বিষয়টি জানার পর শুক্রবার বিকেলে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন ও চুয়াডাঙ্গা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা প্রকৌশলী খালিদ হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখে সমস্যা সমাধানে উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন দামুড়হুদা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক প্রভাষক আবুল হাসেম, দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ মেজবাহ উদ্দিন, দামুড়হুদা প্রেসক্লাব সভাপতি শামসুজ্জোহা পলাশ, সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. হযরত আলীসহ জেলা প্রকৌশলী অফিসের কর্মকর্তা উপজেলা প্রশাসনের কর্মচারী ও স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। কার্পাসডাঙ্গা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ভারি বৃষ্টিপাতে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা বাজার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বাজারের ভেতরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় বেশ কয়েকটি দোকানে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে কাপড়, মুদি, ইলেকট্রনিক্স, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য নষ্ট হয়ে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী খোকন জানান, তার কাপড়ের দোকানে প্রায় ৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে অনেক কাপড় নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী আশরাফুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। এখন কীভাবে ঘুরে দাঁড়াব বুঝতে পারছি না। ব্যবসায়ী রবিউল জানান, তাদের তিনটি দোকানে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, কাপড়সহ কসমেটিকসের অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে ব্যবসায়ী আব্দুল হালিমের দোকানেও পানি ঢুকে বিপুল পরিমাণ কাপড় নষ্ট হয়েছে বলে জানা গেছে। কার্পাসডাঙ্গা বাজার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আলমগীর হোসেন রাসেল বলেন, ভারি বৃষ্টির কারণে বাজারের ভেতরের বেশ কয়েকটি দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাজারে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। আমরা দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সুদৃষ্টি কামনা করছি এবং দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারের স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে। কুড়ুলগাছি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দামুড়হুদায় টানা বৃষ্টিতে কুড়ুলগাছি ও পারকৃষ্ণপুর মদনা ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গ্রামের সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, শাক-সবজি ও অন্যান্য মরসুমি ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্কুল মাঠ ও ঘরে পানি ওঠে গিয়েছে। কুড়ুলগাছির ধান্যঘরা, দুর্গাপুর, ফুলবাড়ি, পারকৃষ্ণপুর মদনা ইউনিয়নের মদনা গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় প্রায় শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়েছে পড়েছে। অনেক গ্রামের ঘরবাড়িতে কোমরসমান পানি উঠেছে। কোথাও কোথাও ঘরের চুলা, গোয়ালঘর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রান্না সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। জীবননগর ব্যুরো জানিয়েছে, জীবননগরে ভারি বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে এবং ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এতে বেড়েছে জনদুর্ভোগ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ওপর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানির প্রবল স্রোতে অনেক স্থানে কাঁচা ও পাঁকা রাস্তা ধ্বসে পড়েছে। বৃহস্পতিবার দিনগত রাত সাড়ে ৩ টা থেকে শুক্রবার সকাল ৯ টা পর্যন্ত ভারি বৃষ্টিপাতে কৃষি জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে বড় ধরনের লোকসানের শঙ্কা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছে চাষিরা। জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে ভারি বৃষ্টিপাতে নিচু এলাকার আউশ ধান, কচু, ধনেপাতা, কলা, আখ, পেঁপে, মরিচসহ শরৎকালীন সবজি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উপজেলার উথলী গ্রামের তরুণ চাষি কৌশিক রহমান বলেন, এক বিঘা জমির ধনেপাতা ডুবে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ৪-৫ দিন পর এটি এক লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারতাম। তাছাড়াও ২ বিঘা জমির ধান ও এক বিঘা জমির ঝাল পানিতে ডুবে গেছে। এভাবে কিছুদিন জমিতে পানি বেঁধে থাকলে ফসলের শিকড় পঁচে নষ্ট হয়ে যাবে। একতারপুর গ্রামের ইউপি সদস্য রতন বলেন, ভারি বৃষ্টিপাতে ফসলের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। তাছাড়া একতারপুর গ্রামের প্রধান সড়কের একাংশ পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে গেছে। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। রাস্তা ভেঙে যাওয়ার কারনে ৭-৮ কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে পৌছাতে হচ্ছে গ্রামবাসীর। রাস্তা ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে উথলী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহুরুল হক ঝন্টু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ও দ্রুত সংস্কার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাছাড়াও জীবননগর পৌরসভা, হাসাদহ, মনোহরপুর, বাঁকা, সীমান্ত, আন্দুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তার ওপর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, পানি যদি ফসলের ক্ষেত থেকে দ্রুত সরে যায় তাহলে ফসলের তেমন একটা ক্ষতি হবেনা।
তিনি আরও জানান, ভারী বর্ষণে ৩৫ হেক্টর আউশ ধান, ৩ হেক্টর মরিচ, ২ হেক্টর চীনাবাদাম, ১০ হেক্টর সবজি, ২ হেক্টর পেঁপে, ১ হেক্টর কলা, ৫ হেক্টর ড্রাগন, ১ হেক্টর মাল্টা, ১ হেক্টর পেয়ারা এবং ৫ হেক্টর ধনেপাতা আক্রান্ত হয়েছে। সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জুয়েল শেখ জানান, ভারী বর্ষণের কারণে উপজেলায় পুকুর, বিল, বাওড় ও ছোট জলাশয়ের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। হাসাদাহ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আকাশের ভারি বৃষ্টি হওয়ায় হাসাদাহসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠঘাট, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ীতে হাটুপানি। নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় জলবদ্ধতার দেখা দিয়েছে এসব এলাকায়। ফলে মাঠের বিভিন্ন ধরনের আবাদঘাট নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত-রাত থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পযর্ন্ত ভারি বৃষ্টি হওয়ায় হাসাদাহ ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠঘাটে ধান, ঝাল, ধনিয়াপাতা, পেয়ারা ও ড্রাগনসহ বিভিন্ন ধরনের আবাদখাটে জমিতে পানি জলাবদ্ধতায় রয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরের পরে বৃষ্টি তেমন না হওয়ায় বেশকিছু আবাদি জমি থেকে পানি সোরে গেছে। কিছু কিছু এলাকার মাঠঘাট নিচু হওয়ায় ধান ও ঝালেরগাছ ও ধনিয়াপাতা আবাদ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও রাস্তাঘাট ও বসতবাড়িতে হাঁটুপানি জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। অবিরাম বৃষ্টির কারনে বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারিনি। এতে দিনমজুরিরা কর্মকাজ করতে না পেরে চরম ভোগান্তি মধ্যে পড়েছে তিনারা। হাসাদাহ বাজারের জনতা ফার্মেসি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ভারি বৃষ্টি হওয়ায় কারনে মানুষজন বাড়ি থেকে বের হতে না পারায় আমাদের হাসাদাহ বাজারে শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পযর্ন্ত অনেক দোকানপাট বন্ধ ছিলো। কিছু দোকান খোলা ছিলো তবে বেচা-বিক্রি একেবারের কম। হাসাদাহের পান্তারমাঠে ধান আবাদকারী কৃষক জহির, মাশিকুর ও এনামুল বলেন, আমাদের ধান বর্তমান পানির নিচে। পানি জলাবদ্ধতা রয়েছে, নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় ধানগুলো এবার হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে।হাসাদাহ ইউনিয়নের দায়িত্বরত কৃষি কর্মকর্তা শিমুল পারভেজ জানান, দীর্ঘদিন পর ভারি বৃষ্টি হওয়ায় হাসাদাহ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মাঠঘাটে পানি জলাবদ্ধতা থাকায় পেয়ারা ও ড্রাগনসহ অন্যন্যা আবাদ তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও কিছু জমির ধান, ঝালগাছ ও ধনিয়াপাতা আবাদ ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। আমরা কৃষকের সাথে এবিষয়ে যোগাযোগ রাখছি। কালীগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া অঝোর ধারার বৃষ্টিতে আজ শুক্রবার সারাদিন অচল হয়ে পড়েছে কালীগঞ্জ শহর।
আকাশভাঙা এই বর্ষণ যেন জনজীবনকে আটকে ফেলেছে এক অদৃশ্য দেয়ালে। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, এমনকি মাঠ-ঘাট এবং অসংখ্য এলাকা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার এই তীব্র রূপ মানুষের দৈনন্দিন স্বাভাবিক ছন্দকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিয়েছে। টানা বৃষ্টির ফলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কম এবং ধীরগতিতে চলছে। বৃষ্টির এই দিনে রাস্তাঘাটে যানবাহন ও মানুষের উপস্থিতি অন্য দিনের তুলনায় অনেক কম। ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত যানবাহনগুলো পানি ও কাদায় আটকা পড়ায় পরিবহন ব্যবস্থায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। চালকরা পড়েছেন চরম সংকটে; ইঞ্জিন বা মোটর বিকল হওয়ার ভয়ে অনেকেই গাড়ি রাস্তায় নামাতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে কর্মজীবী মানুষ ও শুক্রবারের জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ পথচারীরা পড়েছেন সীমাহীন ভোগান্তিতে। সকাল থেকে বৃষ্টির দাপটে বাজারের চিত্রও ছিল ভিন্ন। জনশূন্য প্রায় বাজার এলাকায় দোকানপাট খুললেও ক্রেতা নেই বললেই চলে। পানি নিষ্কাশনের ড্রেনগুলো উপচে ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত জল রাস্তার ওপর উঠে আসায় পথচলা দায় হয়ে পড়েছে। এদিকে বাকুলিয়া, খয়েরতলা, ব্যাক অফিস পাড়া, কলেজপাড়া, গোহাটা শিবনগর ও আড়পাড়াসহ পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা ও কাদার কারণে যাতায়াত ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পৌর সভার ২ নং ওয়ার্ড বাকুলিয়া ব্রাক অফিসের পিছনের এলাকা রাস্তার ওপর পুরু কাদা ও পানির কারণে বাসা-বাড়ি থেকে বের হওয়া বা ফিরে আসা বাসিন্দাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে; অনেক জায়গায় কাদা ও পানিতে পা তলিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বাজারের ব্যবসা মন্দা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি মিলে জনজীবন যেন থমকে গেছে। বিশেষ করে কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন ক্ষতির মুখে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা আর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই কালীগঞ্জকে এমন জলমগ্ন অবস্থায় পড়তে হয়, যা এখন জনদুর্ভোগের স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলার ইউ এনও রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, পানি নিষ্কাশনের কার্যক্রম তো সবসময় চলমান থাকে এখনো চলতেছে। ওই যে কলা হাটায় ওখানে দেখেন করতেছে।












