রাজধানীর একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রকে ব্যক্তিগত বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহার করে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আদম তমিজী হককে আটকে রাখা এবং বিপুল অর্থ আদায়ের চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে এসেছে সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে। ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর, যখন হক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদম তমিজী হক ফেসবুক লাইভে এসে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। এর পরপরই বহুল আলোচিত ‘ডিবি হারুন’ তার পেছনে পুলিশ লাগান এবং এক পর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু তাকে নিয়ম অনুযায়ী আদালতে সোপর্দ বা জেলহাজতে না পাঠিয়ে রাখা হয় রাজধানীর একটি বিলাসবহুল মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে, যেখানে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘মানসিক রোগী’ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চালানো হয় এবং বিনিময়ে পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার অনুসন্ধানে দেখা যায়, তমিজীকে অমানবিকভাবে আটকে রাখার জন্য ‘বীকন পয়েন্ট’ নামের ওই রিহ্যাব সেন্টারটি আলাদাভাবে লাখ লাখ টাকার সার্ভিস চার্জ আদায় করেছিল। তাকে মানসিক রোগী হিসেবে প্রত্যয়ন করতে বাইর থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ডেকে এনে চাপ সৃষ্টি করা হয়। তবে চিকিৎসকদের পেশাদার দল তমিজীকে পরীক্ষা করে কোনো মানসিক অস্বাভাবিকতা না পেয়ে ভুয়া সনদ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন আদালতের কোনো নির্দেশ আছে কি না জানতে চাইলে ডিবি হারুন চরম ক্ষিপ্ত হন এবং নিরাময় কেন্দ্রের কর্মকর্তারা চিকিৎসকদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেন। চিকিৎসক দলের একজন ভুক্তভোগী নাম গোপন রাখার শর্তে ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। পরবর্তীতে ঘটনাটি গোপন রাখতে রিহ্যাব সেন্টারের একটি পুরো তলা খালি করে তমিজীকে একাকী বন্দি রাখা হয় এবং তাকে প্রলোভনে রাখতে বিশেষ খাবার ও বিনোদনের বন্দোবস্ত করা হয়।
নারকোটিক্সের একজন উপপরিচালক স্বীকার করেছেন যে, এই নজিরবিহীন বেআইনি বন্দিশালার খবর তারা জানলেও তখন কিছু করার ছিল না, কারণ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ডিবি হারুনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রভাব খাটানোর সম্পর্ক ছিল সর্বজনবিদিত। শুধু তমিজী হক নন, এই নিরাময় কেন্দ্রগুলোকে ব্যবহার করে স্বামীদের মাদকাসক্ত সাজিয়ে স্ত্রী কর্তৃক সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া, ভাইয়ে-ভাইয়ে বিরোধের জেরে বন্দি রাখা, এমনকি রিহ্যাবের ভেতরে তরুণী রোগীর ওপর যৌন নির্যাতন এবং চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু ঢেকে রাখার মতো অজস্র লোমহর্ষক ঘটনা ঘটলেও ক্ষমতার প্রভাবে অপরাধীরা চিরকাল ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।
















