মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনার দুর্গম আলোকদিয়া চরে চলছে কথিত অবৈধ বালু উত্তোলনের দাপট। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি বালু উত্তোলনকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে নদীর বুক চিরে নির্বিচারে বালু তুলে কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তায় সশস্ত্র ব্যক্তিদের পাহারায় থাকার অভিযোগ থাকলেও কার্যকর প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
২২ আগস্ট ২০২৬,শনিবার সকাল ৭টা। সরেজমিনে আলোকদিয়া চর এলাকায় গিয়ে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে সাতটিরও বেশি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম দেখা যায়। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক বাল্কহেডে বালু লোড-আনলোডের কর্মকাণ্ড চলতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে ‘শাহআলম বাহিনী’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপের সদস্যদের পাহারায় থাকতে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা এই প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
নদী ভাঙছে, বসতি হারাচ্ছে মানুষ—বালু উত্তোলনকারীদের দৌরাত্ম্য কি তার পরও থামবে না?স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অব্যাহতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে যমুনার তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। তাদের দাবি, এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু বসতবাড়ি ও বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। একদিকে মানুষ বসতভিটা ও ফসলি জমি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে,অন্যদিকে নদীর বুক থেকে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চলার অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
আইন আছে, আদালতের নির্দেশনা আছে—তবুও ড্রেজার থামছে না কেন? অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে দেশে বিদ্যমান আইন ও আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আলোকদিয়া চরে এমন কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগ প্রশাসনের সক্ষমতা ও নজরদারি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০ এবং সংশ্লিষ্ট সংশোধিত বিধান অনুযায়ী অনুমোদন ও আইনগত শর্ত উপেক্ষা করে বালু উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু বালু উত্তোলন বন্ধের নয়; বরং কারা এই কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে,কীভাবে তারা নদীর দুর্গম এলাকায় এত বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায়—সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
প্রশাসনের নির্দেশ—মাঠে তার প্রতিফলন কোথায়? শিবালয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. কামরুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে শিবালয় উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে,নির্দেশনা যদি মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়, তাহলে দিনের আলোয় একাধিক ড্রেজার ও বিপুলসংখ্যক বাল্কহেড দিয়ে কথিত অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ কীভাবে চলতে পারে?
প্রশাসনের নির্দেশনা কি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তবে নদীর বুক থেকে বালু লুট বন্ধে অভিযান হবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়। বালু ব্যবসা নয়, জননিরাপত্তার প্রশ্ন,আলোকদিয়ার ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করা এখন জরুরি। কারণ বিষয়টি কেবল অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীভাঙন,বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তার প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য হলে, নদীর দুর্গম চরকে ব্যবহার করে একটি চক্র দিনের পর দিন অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে এবং তাদের প্রতিরোধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার পরিচায়ক হতে পারে না। তাই এখন সময় এসেছে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সরেজমিন তদন্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ইজারা/অনুমোদন যাচাই, অবৈধ ড্রেজার শনাক্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা এবং নদীভাঙনের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণের।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই—দেশের আইন, প্রশাসনের নির্দেশনা এবং জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে কি কোনো বালু উত্তোলনকারী চক্রের প্রভাব থাকতে পারে? আলোকদিয়া চরের মানুষ সেই প্রশ্নের উত্তর চান। আর উত্তরটি শুধু বক্তব্যে নয়—প্রশাসনের দৃশ্যমান ও আইনসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমেই দিতে হবে।














