সর্বশেষ

শিবালয়ে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জাতীয় গ্রিডের টাওয়ার পাশে অবৈধ বালু উত্তোলন

স্টাফ রিপোর্টার

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার দুর্গম আলোকদিয়া চরে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা, একাধিক অভিযান ও স্থানীয়দের ধারাবাহিক প্রতিবাদের পরও থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। বরং প্রশাসনের চোখের সামনেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ বালু উত্তোলনকারী চক্রের তৎপরতা। জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারের একেবারে সংলগ্ন এলাকা এবং জনবসতির পাশে বসানো হয়েছে প্রায় ৮টি ড্রেজার। এসব ড্রেজারের মাধ্যমে যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে শতাধিক বাল্কহেডে বোঝাই ও পরিবহন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট ২০২৬) আলোকদিয়া চর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে জনবসতি ঘেঁষে একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। একই সঙ্গে বাল্কহেডে বালু বোঝাই ও খালাসের কার্যক্রমও চলছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রভাব খাটিয়ে নির্বিঘ্নে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।প্রতিবাদ করলেই ভয়ভীতি,অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ,অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করলেই তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। গত ২২ আগস্ট বসতবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষায় স্থানীয়রা একটি অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে কথিত ‘শাহআলম বাহিনী’র সদস্যরা অস্ত্র প্রদর্শন করে এলাকাবাসীকে ভয়ভীতি দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, বালু উত্তোলনকারীদের প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেও ভয় পাচ্ছেন।ভাঙনের মুখে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জনপদ স্থানীয়দের ভাষ্য,দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীতীরবর্তী এলাকা মারাত্মক ভাঙনঝুঁকিতে পড়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে বসতভিটা,ফসলি জমি ও নদীপাড়ের জনপদ। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারের আশপাশ থেকে বালু উত্তোলন করায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মানববন্ধন, লিখিত অভিযোগ—তবুও বন্ধ হচ্ছে না বালু উত্তোলন।

অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী এরই মধ্যে একাধিকবার মানববন্ধন করেছেন। জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তারা। এমনকি বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরে আনার দাবিতেও কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয়রা। তবে অভিযোগ রয়েছে, একের পর এক অভিযোগ এবং প্রশাসনিক অভিযান সত্ত্বেও অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। অভিযানের খবর আগেই পৌঁছে যায়—প্রশ্ন উঠছে ‘তথ্য ফাঁস’ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের তীর বিশেষভাবে নৌপুলিশের ভূমিকার দিকে। তাদের দাবি, উপজেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও নৌপুলিশের নিয়মিত ও কার্যকর তৎপরতার অভাবে অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই আবার শুরু হয়ে যায় অবৈধ বালু উত্তোলন।স্থানীয়দের অভিযোগ,শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা রানী কর্মকার একাধিকবার অভিযান পরিচালনার জন্য ঘটনাস্থলে গেলেও অভিযানের খবর আগেই অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে প্রশাসনের অভিযান শুরুর আগেই ড্রেজার সরিয়ে নিয়ে চক্রটি আত্মগোপন করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে,প্রশাসনের গোপন অভিযান পরিকল্পনার খবর বারবার অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে কীভাবে?নৌপুলিশের নিয়মিত টহল কোথায়—স্থানীয়দের প্রশ্ন

পাবনা সদর থানার এসআই মাহবুব রাজশাহী রেঞ্জের ‘শ্রেষ্ঠ অস্ত্র উদ্ধারকারী অফিসার’ নির্বাচিত

স্থানীয়দের দাবি,অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে যমুনা নদীতে নৌপুলিশের নিয়মিত টহল থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা এ বিষয়ে অনেকটাই উদাসীন। দিনের পর দিন জাতীয় গ্রিডের টাওয়ার ও জনবসতির পাশে প্রকাশ্যে একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চললেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও।

ডিসি ও নৌপুলিশের এসপির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুনআরা সুলতানার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নৌপুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর জোন নৌপুলিশের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলামের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনিও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, উপজেলা প্রশাসনের অভিযান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনার দাবি থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ—অভিযানের আগেই যদি অবৈধ ড্রেজার সরিয়ে ফেলা হয়, তাহলে অভিযানের তথ্য কার মাধ্যমে বাইরে যাচ্ছে, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।আইন ও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং পরবর্তী সংশোধনীসহ প্রচলিত আইন অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া নদী থেকে বালু উত্তোলন আইনত দণ্ডনীয়। একই সঙ্গে যমুনাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে আদালতের বিভিন্ন নির্দেশনাও রয়েছে।তাদের মতে, এসব আইন ও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে দিনের পর দিন অবৈধ বালু উত্তোলন চলতে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আসে।শুধু ড্রেজার জব্দ নয়, মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি

এলাকাবাসীর দাবি, মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কিংবা ড্রেজার জব্দ করলেই এই চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না। অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল হোতা, অর্থের জোগানদাতা, ড্রেজার মালিক, বালু পরিবহনকারী এবং কথিত সশস্ত্র পাহারাদারদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নদীভাঙন ও জনবসতি রক্ষায় কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

পাচারের সময় চুয়াডাঙ্গায় ১ কোটি টাকার স্বর্ণসহ চোরাকারবারি আটক

প্রশাসনের চোখের সামনে কারা চালাচ্ছে এই ‘বালুর সাম্রাজ্য’?স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান হচ্ছে, অভিযোগ জমা পড়ছে, মানববন্ধন হচ্ছে—কিন্তু কিছুতেই থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। বরং প্রশাসনিক তৎপরতার পরপরই আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে ড্রেজারগুলো।তাহলে প্রশ্ন উঠছে—প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও অভিযানের পরও কার ছত্রচ্ছায়ায় চলছে এই বালু উত্তোলন? অভিযানের খবর আগেই কারা পৌঁছে দিচ্ছে? জাতীয় গ্রিডের টাওয়ার ও জনবসতির এত কাছে ড্রেজার বসানোর সুযোগই বা কীভাবে মিলছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে শুধু মাঠপর্যায়ের অভিযান নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের অর্থের উৎস, ড্রেজারের মালিকানা, বালু পরিবহনের নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অন্যথায় প্রশাসনের চোখের সামনে দিনের পর দিন চলতে থাকা এই অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু নদী, পরিবেশ ও জনবসতির জন্যই নয়—জাতীয় গ্রিডের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং সামগ্রিক জননিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এখন দেখার বিষয়,অভিযোগের পর অভিযোগ এবং প্রকাশ্য অবৈধ তৎপরতার পরও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কথিত বালু মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেয় কি না।

ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT

দৈনিক আমাদের খবর একটি বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদমাধ্যম। দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদ ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নির্ভুলতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

×

নিউজ কার্ড প্রিভিউ (HTML Version)

News Image
২৯ আগস্ট ২০২৬
Trulli

শিবালয়ে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জাতীয় গ্রিডের টাওয়ার পাশে অবৈধ বালু উত্তোলন