মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম আলোকদিয়া চর এলাকায় থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারসংলগ্ন এলাকায় জনবসতির ঘেঁষে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একাধিক ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যেই চলছে বালু উত্তোলন। উত্তোলিত বালু পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে শতাধিক বাল্কহেড।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল সাড়ে ৭টা ৩০ মিনিটে সরেজমিন অনুসন্ধানে আলোকদিয়া চর এলাকার জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারসংলগ্ন কয়েকটি পয়েন্টে ৯টির অধিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। একই সময়ে ওইসব ড্রেজার থেকে বিপুলসংখ্যক বাল্কহেডে বালু লোড-আনলোডের কার্যক্রমও চলতে দেখা যায়।এ সময় বালু উত্তোলনস্থলে সশস্ত্র পাহারায় স্থানীয় শাহআলম বাহিনীর সদস্যদের দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম চরাঞ্চলের সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী বালু উত্তোলনকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহন করে আসছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।হাইকোর্টের নির্দেশনার পরও প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন। শিবালয়ের আলোকদিয়া চর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ বিষয়ে প্রতিবেদন মহামান্য হাইকোর্টে দাখিলের নির্দেশনা রয়েছে বলে জানা গেছে।কিন্তু আদালতের এমন নির্দেশনার পরও আলোকদিয়া চরে প্রকাশ্যেই ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন এবং বাল্কহেডে বালু পরিবহনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সেই পদক্ষেপের কার্যকারিতা কোথায়?
একদিকে আদালতের নির্দেশনা, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর অতি কাছাকাছি একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন—পুরো বিষয়টিই এখন গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে প্রশাসনের দায় কতটুকু?আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের কোনো নির্দেশনা কার্যকর থাকার পরও যদি তার আওতাভুক্ত এলাকায় প্রকাশ্যে কার্যক্রম চলতে থাকে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।
আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট পরিধি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর তার প্রযোজ্যতা যাচাই সাপেক্ষে আদেশ অমান্যের বিষয়টি আইনগতভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।তাদের মতে, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ওপর থাকলে নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গাফিলতি, নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, ড্রেজারের মালিকানা, বালু উত্তোলনের অনুমোদন এবং বাল্কহেডে পরিবহনের বৈধতা—সবকিছুই যাচাই করা প্রয়োজন।
জাতীয় গ্রিডের টাওয়ার ঘেঁষে বালু উত্তোলন
জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারের কাছাকাছি এলাকায় ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারের আশপাশের নদীতল থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের গঠন ও স্থিতিশীলতায় কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা, নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে জানতে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন আরা সুলতানার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়।তিনি ফোন রিসিভ না করলেও টেক্সট বার্তায় জানান,তিনি মিটিংয়ে আছেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব হাসানের সরকারি নম্বরেও একাধিকবার ফোন করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
জরুরি তদন্তের দাবি,আদালতের নির্দেশনা থাকা অবস্থায়ও যদি আলোকদিয়া চরে প্রকাশ্যেই অবৈধ বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে বিষয়টি কেবল পরিবেশ ও নদীসম্পদ রক্ষার প্রশ্ন নয়; বরং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত।
তাই অবিলম্বে ঘটনাস্থলে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনা, ড্রেজার ও বাল্কহেডের বৈধতা যাচাই, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তকরণ এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং আলোকদিয়া চর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন কীভাবে এখনো প্রকাশ্যে চলমান রয়েছে—সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।















