মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম আলোকদিয়াচর এলাকায় মহামান্য হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা ও বালুমহাল এবং মাটি ব্যবস্থাপনা আইন,২০১০-এর বিধান অমান্য করে সংঘবদ্ধ একটি বালু মাফিয়া চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে সক্রিয় আছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি,প্রতিদিন একাধিক ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করে শত শত বাল্কহেডে লোড-আনলোড করা হচ্ছে, অথচ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নাই।
ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আলোকদিয়াচর এলাকায় বর্তমানে অন্তত ৮ থেকে ১০টি সেকশন-কাটার ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। এসব ড্রেজারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় দুই শতাধিক বাল্কহেডে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। এভাবে অব্যাহত বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে ও জনবসতি,কৃষিজমি,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে দাবি করেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য,নিজেদের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার রক্ষার দাবিতে ভুক্তভোগীরা চরাঞ্চলের বাসিন্দারা গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। পরবর্তীতে ২০ জুন আলোকদিয়াচরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনায় মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এছাড়া ৭ জুলাই দুই শতাধিক নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে আবারও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। তবে এসব কর্মসূচির পরোও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ,অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও প্রশাসনিকভাবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখতে বহিরাগত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে স্থানীয়দের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রতিরোধ দমনের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি,পাটুরিয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ি ও পাটুরিয়া কোস্ট গার্ড স্টেশনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগেই নদীপথে প্রকাশ্যে এই অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারত না।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে, নৌপুলিশের ফরিদপুর জোনের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলামের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলোও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে পাটুরিয়া কোস্ট গার্ড স্টেশনের ইনচার্জের সরকারি মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।এদিকে শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে সরেজমিনে আলোকদিয়াচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় আটটি ড্রেজার দিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে,জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিকটবর্তী স্থানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুধু বালুমহাল এবং মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি পরিবেশ, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের জন্য গুরুতর হুমকি। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে তা আইনের শাসনের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই অবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধ ড্রেজার জব্দ,দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।













