সর্বশেষ

১৯১৫-এর রেল মানচিত্রে ময়মনসিংহ-জারিয়া-লেংগুরা রেলপথ: ইতিহাসে এক অসমাপ্ত অধ্যায়

জেলা প্রতিনিধি

এক শতাব্দীরও বেশি আগে ব্রিটিশ ভারতের রেলওয়ে পরিকল্পনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহকে ঘিরে যে যোগাযোগ-ভাবনা করা হয়েছিল, তার একটি বিস্মৃত অধ্যায় আজও ইতিহাসের পাতায় প্রশ্ন হয়ে আছে। ময়মনসিংহ জংশন থেকে গৌরীপুর জংশন, শ্যামগঞ্জ, জারিয়া-ঝাঞ্জাইল হয়ে সুসং দুর্গাপুর -কলমাকান্দার লেংগুরা বাজার পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের একটি পরিকল্পনার চিহ্ন পাওয়া যায় ১৯১৫ সালের একটি ঐতিহাসিক রেল নেটওয়ার্ক মানচিত্রে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু শতবর্ষেরও বেশি পুরোনো সেই মানচিত্র আজ নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রেললাইনটি যদি সত্যিই লেঙ্গুরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাত, তাহলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের অর্থনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত-যোগাযোগ এবং পর্যটনের চিত্র কি আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো?

১৯৪৭ সালের দেশভাগের ফলে গারো পাহাড়ি অঞ্চল এবং লেঙ্গুরা বাজার সংলগ্ন উত্তরের ভূখণ্ডটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে ব্রিটিশদের পরিকল্পিত এই রেলরুটটি অসমাপ্ত থেকে যায়। যদি দেশভাগের আগে বা ব্রিটিশ আমলে এই লাইনটি চালু হতো, তবে এই অঞ্চলের সীমানা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্থায়ী এক পরিবর্তন আসত। সুসং দুর্গাপুরের পাহাড়ি অঞ্চলের সঙ্গে দেশের মূল জনপদের দূরত্ব ঘুচে যেত এবং ল্যাংগুরা বাজার হয়ে উঠত দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় সীমান্তবর্তী অর্থনৈতিক ও পর্যটন জোন।

এই ম্যাপের পরিকল্পনার অনুযায়ী ময়মনসিংহ জংশন থেকে গৌরীপুর জংশন, শ্যামগঞ্জ ও জারিয়া ঝাঞ্জাইল পর্যন্ত অর্থাৎ কংশ নদীর তীর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে নদীর তীর পেরিয়ে সুসং দুর্গাপুর-কলমাকান্দার লেংগুরা বাজার (Lengura Bazar) পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের ছিল। স্থানীয় ইতিহাস, রেল যোগাযোগ ও আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এ প্রশ্নটি এখন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

গবেষণায় ব্যবহৃত ১৯১৫ সালের ঐতিহাসিক রেল নেটওয়ার্ক মানচিত্রটি ব্রিটিশ ভারতের রেলওয়ে-পরিকল্পনার সময়কার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে সামনে এসেছে। বর্তমানে এটি রামসে কালেকশনে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক মানচিত্র যা ব্রিটিশ ভারতের রেলওয়ে বোর্ডের ১৯১৫ সালের প্রকাশিত ‘Bengal Atlas Map’ (লেখক: J. H. Trott ও Railway Board, India)-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। রামসে কালেকশন (Rumsey Collection): মানচিত্রটির মূল তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করছেন এই ফিচারের লেখক গবেষক মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার। ঐতিহাসিক এই রেলওয়ে-ভাবনার তথ্য ও মানচিত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে গৌরীপুরভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন ও গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগ।গবেষক মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার ১৯১৫ সালের ঐতিহাসিক মানচিত্রের তথ্য বাংলা ভাষাভাষী গবেষক ও সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে এতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্য সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

প্রত্যেক অপরাধীর বিচার এ দেশেই হবে, সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন”প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল

এ গবেষণা-উদ্যোগের সঙ্গে এসিক এসোসিয়েশন (ACECC Association), ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরি (Creative Association Historical Society and Library) এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স (The Electoral Committee for Pen Award Affairs) এর সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য ২০২০, ২০২১-২২, ২০২৩ এবং ২০২৪-২৫ সালের পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স ( Pen Award Affairs ) ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে বলে গবেষণা-উপাদানে উল্লেখ রয়েছে। ঐতিহাসিক মানচিত্রটির উপস্থাপনা ও গ্রাফিক বিন্যাসেও ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন (Creative Association) যুক্ত ছিল।

১৯১৫ সালের এই ঐতিহাসিক দলিল মানচিত্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে—পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবে আমরা কতটা সম্ভাবনাময় একটি পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র ও বাণিজ্যিক জোন হারিয়েছি। সরেজমিন ও গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শেকড়সন্ধানী তথ্য ধারাবাহিকভাবে আরও উপস্থাপন করা যেতে পারে ।

ল্যাংগুরা বাজারটি গারো পাহাড়ের পাদদেশে আসাম-মেঘালয় অঞ্চলের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। এই পর্যন্ত রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে এটি ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বঙ্গ অঞ্চলের একটি অন্যতম প্রধান ট্রানজিট ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারত। এটি হতো এই অঞ্চলের প্রথম পাহাড়ঘেঁষা পর্যটন রেলওয়ে স্টেশন। ট্রেন থেকে নেমেই সরাসরি গারো পাহাড়ের পাদদেশ, ঝরনা ও সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হতো।

একসময় যোগাযোগব্যবস্থা ছিল মূলত নদী, কাঁচা সড়ক ও স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক। রেললাইন যদি জারিয়া-ঝাঞ্জাইল অতিক্রম করে ল্যাংগুরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাত, তাহলে পাহাড়ের পাদদেশের জনপদটি বৃহত্তর ময়মনসিংহের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারত। এর ফলে কৃষিপণ্য, বনজ সম্পদ, স্থানীয় হস্তশিল্প ও অন্যান্য পণ্য বৃহত্তর বাজারে দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ পেত। একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, গৌরীপুর ও অন্যান্য বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে পণ্য ও মানুষও সহজে পাহাড়ঘেঁষা অঞ্চলে যাতায়াত করতে পারত।

অর্থনীতির ভাষায়, এমন একটি রেল সংযোগ কেবল একটি স্টেশন তৈরি করত না; বরং এর চারপাশে নতুন বাজার, গুদাম, পরিবহনকেন্দ্র, হাট-বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ ঘটানোর সম্ভাবনা তৈরি করত।

প্রত্যেকঅপরাধীর বিচার এ দেশেই হবে, সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন” প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল

ব্রিটিশ ভারতের দেশভাগে গারো পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং ল্যাংগুরা বাজারসংলগ্ন সীমান্তভূমির একটি অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এর ফলে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহাসিক যোগাযোগের ভূগোলও আমূল পরিবর্তিত হয়। দেশভাগের আগে যে অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা সম্ভব ছিল, দেশভাগের পর সেটিই হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকা।

রেললাইনটি যদি দেশভাগের আগেই নির্মিত হতো, তাহলে পরবর্তী সীমান্ত-বাস্তবতায় এর ভূমিকা কী হতো—এ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়া কঠিন। তবে এটুকু অনুমান করা যায়, একটি বিদ্যমান রেল অবকাঠামো সীমান্ত-অর্থনীতি, যাত্রী চলাচল, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক ভূগোলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারত। অন্যদিকে দেশভাগের পর আন্তর্জাতিক সীমান্তই হয়ে ওঠে এই রেল-সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় বাস্তবিক ও রাজনৈতিক বাধাগুলোর একটি।

যদি সেই রেলপথ বাস্তবায়িত হতো, তাহলে হয়তো ল্যাংগুরা বাজার আজ শুধু একটি সীমান্তবর্তী বাজার নয়—হতে পারত ময়মনসিংহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল-পর্যটন প্রবেশদ্বার। গারো পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠতে পারত নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল, পর্যটনকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের কেন্দ্র। সুতরাং ১৯১৫ সালের সেই মানচিত্র আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অসমাপ্ত গল্পের মতো।

এক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ল্যাংগুরা বাজার ও গারো পাহাড়ের পাদদেশের যোগাযোগ-সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং নতুন বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনাকে অন্যভাবে দেখা যেতে পারে। আজ রেললাইন নির্মাণের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সড়ক যোগাযোগ, পর্যটন করিডর, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, সীমান্তবাণিজ্য, স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বিশেষ করে গারো পাহাড়ের পাদদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক সুসং দুর্গাপুর এবং ল্যাংগুরা এলাকার সম্ভাবনাকে একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনা গেলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের পর্যটন মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। যদিও বর্তমান ভূরাজনৈতিক সীমানা এবং মানচিত্রের অপ্রতুলতার কারণে সেই সুযোগ আজ হারিয়ে গেছে, তবুও ১৯১৫ সালের এই ঐতিহাসিক দলিল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে—পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবে আমরা কতটা সম্ভাবনাময় একটি পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র ও বাণিজ্যিক জোন হারিয়েছি।

ADVERTISEMENT

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত


সম্পাদক ও প্রকাশক : মাে:শফিকুল ইসলাম

কার্যালয় : ভাদাইল, ডিইপিজেড রোড, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা-১৩৪৯

যোগাযোগ: +৮৮০ ১৯১ ১৬৩ ০৮১০
ই-মেইল : dailyamaderkhobor2018@gmail.com

দৈনিক আমাদের খবর বাংলাদেশের একটি বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে দৈনিক আমাদের খবর, অনলাইন নিউজ পোর্টালটি সব ধরনের খবর প্রকাশ করে আসছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রচারিত অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলির মধ্যে এটি একটি।

ADVERTISEMENT
×

নিউজ কার্ড প্রিভিউ (HTML Version)

News Image
০৭ আগস্ট ২০২৬
Trulli

১৯১৫-এর রেল মানচিত্রে ময়মনসিংহ-জারিয়া-লেংগুরা রেলপথ: ইতিহাসে এক অসমাপ্ত অধ্যায়