মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম আলোকদিয়া চর এলাকায় মহামান্য হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অমান্য করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারসংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকার মাত্র ১০০ গজের মধ্যে একাধিক ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন ও পরিবহন করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি,একটি সশস্ত্র চক্রের পাহারায় বালু উত্তোলনকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এতে নদীভাঙন,বসতবাড়ি ও ফসলি জমির ক্ষতি,বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বুধবার (১৯ আগস্ট ২৬ইং) সকাল ৭টা থেকে সরেজমিনে আলোকদিয়া চরের জাতীয় গ্রিডের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারসংলগ্ন এলাকায় অন্তত ছয়টি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন এবং শতাধিক বাল্কহেডে বালু লোড-আনলোডের কার্যক্রম দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ,শিবালয় এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ৩ এপ্রিল আলোচিত মিরাজ হত্যা মামলার ঘটনা ঘটে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, এসব ঘটনার পরও অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
তবে স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগের পাশাপাশি ভিন্ন চিত্রও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও শিবালয় উপজেলা প্রশাসন অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে। শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিষা রানী কর্মকারও ঝুঁকি নিয়ে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু অভিযানের খবর আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়ায় অনেক সময় অভিযান চালিয়েও কাউকে আটক বা সরঞ্জাম জব্দ করা সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে ব্যর্থতা প্রশাসনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, নাকি কোনো পক্ষের গাফিলতি—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির যোগসূত্র নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগের সবচেয়ে বড় অংশ পাটুরিয়া নৌপুলিশকে ঘিরে। তাদের দাবি, নৌপুলিশের কিছু সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশের কারণেই একটি চক্র নির্বিঘ্নে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট নৌপুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
একজন জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করেন, কিছুদিন আগে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে পাটুরিয়া নৌপুলিশের ইনচার্জকে ফোন করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর পরিচয় ও মোবাইল নম্বর বালু উত্তোলনকারী চক্রের সদস্যদের কাছে পৌঁছে যায়। বিষয়টি নিয়ে তিনি নৌপুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং তাঁকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয় বলে ওই গণমাধ্যমকর্মীর দাবি।
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুর জোন নৌপুলিশের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলামের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল গ্রহণ করেননি বলে জানা গেছে। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা বলছেন, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত আইন অমান্য করে যদি সত্যিই জাতীয় গ্রিডের সঞ্চালন টাওয়ার ও জনবসতির কাছাকাছি বালু উত্তোলন চলতে থাকে,তাহলে তা শুধু পরিবেশ ও ভূমি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়—এটি জননিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট। তারা অবিলম্বে অভিযান জোরদার, অবৈধ ড্রেজার জব্দ এবং বালু উত্তোলনের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।














