পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নসংলগ্ন পদ্মা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে আইনকানুন তোয়াক্কা না করে দিন-রাত অবাধে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। চরতারাপুর, কলাবাগান, নিউচর পূর্বপাড়া, বেলতলাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে একাধিক ড্রেজার, যা থেকে প্রতিনিয়ত শত শত বাল্কহেডে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। নদী দখল করে চলা এই বালু সাম্রাজ্য পাহারা দিচ্ছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা, অন্যদিকে রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন।
গত (১৮, ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)সরেজমিনে অনুসন্ধানে জোতকাকুরিয়া, গোহাইলবাড়ী মৌজা, ভাদুরিয়াডাঙ্গী, চর ভবানীপুরসহ পদ্মার সীমান্তবর্তী নদী এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে দিন-রাত বালু তোলার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ,নদীর দুর্গম এলাকাগুলোকে নিরাপদ ঘাঁটি বানিয়ে সশস্ত্র পাহারা বসিয়েছে চক্রটি। অনুসন্ধানের সময় দুটি স্পিডবোটে সশস্ত্র ব্যক্তিদের মহড়া দিতে দেখা গেছে। এই সশস্ত্র মহড়ার কারণে সাধারণ নদীপাড়ের মানুষ তো বটেই, সংবাদকর্মীদের জন্যও পেশাগত দায়িত্ব পালন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে স্পিডবোটে অবস্থানরত সশস্ত্র ব্যক্তিদের পরিচয় বা তাদের অস্ত্রের বৈধতা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
’বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ এবং ২০২৩ সালের সংশোধিত বিধান অনুযায়ী নদী বা পরিবেশের ক্ষতি করে বালু তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নদীভাঙন, প্রতিবেশ এবং নৌপথের ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট বালুমহাল বাতিলসহ ড্রেজার ও যানবাহন বাজেয়াপ্ত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও পাবনার পদ্মায় তার কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।
এলাকাবাসীর দাবি,একটি অসাধু অংশকে ‘ম্যানেজ’ করেই দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছে একটি প্রভাবশালী চক্র। এমনকি প্রশাসনের কোনো অভিযানের খবর থাকলে তা আগেভাগেই ফাঁস হয়ে যায়, ফলে অভিযানের আগেই ড্রেজার ও বাল্কহেডগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। তবে অসাধু যোগাযোগের এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ মেলেনি।
উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতি ও প্রশাসনের পদক্ষেপ জানতে পাবনা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো.আমিনুল ইসলামের সরকারি নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এসব পয়েন্টে বালু উত্তোলনের কোনো বৈধ ইজারা আছে কি না, কিংবা অবৈধ উত্তোলনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অপরিকল্পিত ও টানা বালু উত্তোলনের ফলে পদ্মার গতিপথ পরিবর্তন,ভয়াবহ নদীভাঙন এবং আশপাশের ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। সচেতন মহলের প্রশ্ন—পদ্মার বুক থেকে তোলা এসব বালু যাচ্ছে কোথায়? কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এসব ড্রেজার-বাল্কহেড? আর সশস্ত্র পাহারাদারদের পেছনে মূল ইন্ধনদাতাই বা কারা?
রাষ্ট্রীয় সম্পদ পদ্মা নদীকে কতিপয় ব্যক্তির পকেটের হাতিয়ার বানানো বন্ধে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী। বিচ্ছিন্ন অভিযানের নাটক না করে ইজারার বৈধতা যাচাই, ড্রেজার-বাল্কহেড বাজেয়াপ্ত এবং অস্ত্রধারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।














