ঢাকার ধামরাই উপজেলার কুশুরা ইউনিয়ন ভূমি অফিস এখন যেন এক বহিরাগত ব্যক্তির ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি কোনো পদে না থেকেও অফিসের ভেতরে টেবিল-চেয়ার বসিয়ে নিয়মিত সেবাগ্রহীতাদের নামজারি (খারিজ) ও জমাভাগ আবেদনের ফাইল যাচাই-বাছাই করছেন ‘মনির’ নামের এক ব্যক্তি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা না হয়েও তিনি প্রশাসনিক নথিপত্র নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং ঘুষের বিনিময়ে ফাইল পাস বা বাতিলের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি একটি সংবেদনশীল দপ্তরে বসে দিনের পর দিন এভাবে বেআইনি কর্মকাণ্ড চালানোর নেপথ্যে তার খুঁটির জোর কোথায়?
স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,কুশুরা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে সাধারণ মানুষ প্রথম দর্শনে মনিরকে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী ভেবে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেন। তিনি অফিসের ভেতরের একটি টেবিলে বসে দাপটের সঙ্গে জমি-সংক্রান্ত নথিপত্র নাড়াচাড়া করেন এবং খারিজসহ নানা বিষয়ে চুক্তি করেন।
অভিযোগ রয়েছে,যেসব সেবাগ্রহীতা মনিরের মাধ্যমে আর্থিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন, তাদের নামজারির আবেদনগুলোই কেবল ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) ইতিবাচক প্রস্তাব হিসেবে উপজেলা ভূমি অফিসে প্রেরণ করেন। অন্যদিকে, যাদের নথিপত্র ১০০% সঠিক থাকা সত্ত্বেও আর্থিক চুক্তি বা ঘুষ দেওয়া হয় না, তাদের আবেদনগুলো বাতিল করে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, মনিরের ইশারায় অন্তত ৭০ শতাংশ সঠিক নামজারি আবেদন কোনো কারণ ছাড়াই বাতিল বা ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে।
ভূমি সেবা নিতে আসা একাধিক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান,সরকারি অফিসে বহিরাগত কারো এভাবে প্রভাব খাটানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। টাকা ছাড়া সাধারণ মানুষ এখানে কোনো সেবা পাচ্ছে না। মনিরের এই মধ্যস্থতা ও দালালির বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন,”তিনি যদি সরকারি কর্মকর্তা না হন,তবে সরকারি নথিপত্র যাচাই-বাছাই ও টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসার অনুমতি তাকে কে দিল?”
প্রশাসনের নজরদারির দাবি: সরকারি কোনো দপ্তরে বহিরাগত ব্যক্তির প্রবেশাধিকার ও গোপনীয় ফাইল নাড়াচাড়া করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সচেতন এলাকাবাসীর দাবি, এ বিষয়ে কুশুরা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি দপ্তরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কুশুরা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার)-এর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,’মনির নামের ব্যক্তিটি অফিসের সরকারি কোনো কর্মচারী নন। সেবাগ্রহীতাদের ভিড়ে তিনি হয়তো কখনো অফিসে আসতে পারেন,তবে নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা বা ফাইল বাতিলের সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো কোনো ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়নি। তিনি অফিসে বসে কোনো ফাইল নাড়াচাড়া করেন কি না,তা আমার জানা নেই। তবে লিখিত কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বা বেআইনি কোনো হস্তক্ষেপ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, বিষয়টি সম্পর্কে ধামরাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান,’সরকারি দপ্তরে কোনো বহিরাগত বা দালাল চক্রের টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসা কিংবা নথিপত্র নিয়ন্ত্রণ করার কোনো সুযোগ নেই। যদি কুশুরা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখছি। তদন্তে কোনো বহিরাগতের বেআইনি হস্তক্ষেপ বা অফিসের কারো গাফিলতি পাওয়া গেলে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

















