বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাদের কাজ সময়ের সীমা পেরিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর সেই তালিকায় আছেন। একজন সিনেমার মাধ্যমে মানুষের মাঝে আলো ছড়াতে বিশ্বাস করতেন, আরেকজন ক্যামেরায় ধারণ করতেন সেই আলো, জীবন ও সত্যের গল্প।
তারেক মাসুদ ছিলেন স্বাধীনধারার সিনেমার পথিকৃৎ। প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’, ‘মুক্তির গান’, ‘মুক্তির কথা’ এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’, ‘অন্তরযাত্রা’, ‘রানওয়ে’ প্রতিটি কাজই শিল্পমান ও গল্প বলার ক্ষেত্রে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ‘মাটির ময়না’ শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের গর্ব হয়ে দাঁড়ায় কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপরেস্কি পুরস্কার জিতে নেয় এবং প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়।
অন্যদিকে, আশফাক মিশুক মুনীর ছিলেন ক্যামেরার এক জাদুকর। বিবিসি সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ভিডিও সাংবাদিক হিসেবে কাজ করে তিনি বাংলাদেশের চিত্রগ্রহণের মানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। শহিদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে মিশুক দেশবিদেশের অগণিত মানুষের কাছে ছিলেন ‘মিশুক ভাই’ প্রাণবন্ত, নির্ভীক ও শিল্পসত্তায় ভরপুর। ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্রে প্রধান চিত্রগ্রাহক হিসেবে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
তাদের জীবনপথের শেষ যাত্রা হয় একসঙ্গে, ২০১১ সালের ১৩ আগস্টে মানিকগঞ্জে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায়। ‘কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রের লোকেশন দেখতে গিয়ে ফেরার পথে তারা হারিয়ে যান চিরতরে। এই দুর্ঘটনা শুধু দুই প্রতিভাকে কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে বাংলাদেশের সিনেমার দুটি উজ্জ্বল বাতিঘরকেও।
আজ তাদের রেখে যাওয়া কাজ নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করছে। তারেক মাসুদের বিশ্বাস ছিল সিনেমা দিয়ে মানুষের মাঝে আলো ছড়ানো। মিশুক মুনীরের বিশ্বাস ছিল সত্যকে সুন্দরভাবে ধারণ করা। এই দুই বিশ্বাস আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনকে পথ দেখায়।











