এক সময় গ্রামবাংলার দুপুর-বিকাল কাঁপিয়ে দিত এক মায়াবী ডাক। দূর থেকে ভেসে আসত— ‘দেখো দুলদুল ঘোড়া, মক্কা-মদিনা, ক্ষুদিরামের বীরগাথা…’। শিশুরা দৌড়ে যেত, কিশোররা সারি বেঁধে দাঁড়াত, আর বয়স্ক মানুষজন কৌতূহলের টানে চোখ রাখত টিনের তৈরি সেই ছোট্ট চারকোনা বাক্সে। নাম ‘বায়োস্কোপ’। সেই বায়োস্কোপই ছিল উপমহাদেশের মানুষের জন্য রুপালি পর্দা। আজ যখন স্মার্টফোন, ইউটিউব আর ডলবি সাউন্ডের বড় পর্দার সিনেমা হলে ছেয়ে গেছে পৃথিবী, তখন বাংলার বায়োস্কোপ দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নিঃশব্দ কোণে। আজ বলব সেই জাদুর বাক্সের গল্প।
চারকোনা একটি টিনের বাক্স, সামনে গোলাকৃতি কয়েকটি কাচের জানালা। কোনো বাক্সে ৪টি, কোনোটিতে ৬টি, আবার কোনো বাক্সে ৮টি জানালা। ভেতরে ছবি জোড়া লাগানো ৩৫ থেকে ৪০টি স্ট্রিপ। ঘুড়ির নাটাইয়ের মতো দেখতে চাকা ঘোরালে ছবিগুলো এগোতে থেকে সামনে— স্থির অথচ চলমান। এদিকে পাশে দাঁড়িয়ে সুর তুলে সেই সব ছবির গল্প বলত বায়োস্কোপওয়ালা। পরনে রঙ-বেরঙের কাপড়, হাতে খঞ্জনি। সেই সুরই দর্শকদের নিয়ে যেত কল্পনার রাজ্যে। মক্কা-মদিনা থেকে দুলদুল ঘোড়া, আজমির শরীফ থেকে ক্ষুদিরামের ফাঁসি—ছবি হয়ে সব ভেসে উঠত চোখের সামনে। প্রতিটি জানালার এপারে শিশুর কৌতুহলী এক জোড়া চোখ, আর ওপারে অদেখা এক জাদুর পৃথিবী। একটি শিশু যখন প্রথমবার চোখ রাখত কাচে—তার সামনে খুলে যেত বিস্ময়ের দরজা।
বায়োস্কোপের স্বর্ণযুগ: শেকড় থেকে শহর পর্যন্ত
বায়োস্কোপের শুরু ১৯ শতকের শেষ দিকে। সত্তরের দশকেও বাংলার শহর থেকে গ্রাম, সবখানে দেখা যেত বায়োস্কোপওয়ালাদের। মেলায় চায়ের দোকানের পাশে বা স্কুল মাঠে—যেখানে ভিড় সেখানেই বায়োস্কোপের আশ্চর্য উপস্থিতি। টাকা দিতেই শুরু হতো গল্প— বাদশাহ-রানির রূপকথা, দেশ-বিদেশের দৃশ্যপট, কাল্পনিক পরলোকের ছবি, নায়ক-নায়িকার ফ্রেমবন্দি ভঙ্গিমা—সবই পুঁটলি বেঁধে আনত সেই যাদুর বাক্সওয়ালা। এ যেন বিনোদনের এক আদি উৎসব, যেখানে ছবি মানেই গল্প, আর গল্প মানেই স্বচ্ছ কাচের ওপারে অনন্ত বিস্ময়।
ইউরোপ ও উপমহাদেশীয় টিনের বায়োস্কোপের পার্থক্য
বায়োস্কোপের ইতিহাস বলতে গেলে অনেকেই ইউরোপের বায়োস্কোপ ও ভারতীয় উপমহাদেশর টিনের চৌক বায়োস্কোপের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। দুটোরই শুরু ১৯ শতকের শেষ দিকে। তবে ছিল বিস্তর পার্থক্য। ইউরোপে উদ্ভাবিত বায়োস্কোপ মূলত যান্ত্রিক প্রজেক্টর হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছিল। ধাতব অংশ এবং উন্নত লেন্স ব্যবহার করা হতো যা অন্ধকার ঘরে বা হলে বড় পর্দায় ছবি প্রক্ষেপণ করত। ফটোগ্রাফিক ফিল্মের মাধ্যমে গতিশীল ছবি (চলচ্চিত্র) দেখানো হতো। এতে প্রথমদিকে নীরব ও পরে সবাক চলচ্চিত্র জন্ম নেয়।

অন্যদিকে, উপমহাদেশর টিনের বায়োস্কোপ স্থানীয়ভাবে তৈরি কাঠের বা টিনের বাক্স, যা সহজে বহনযোগ্য। যেখানে দর্শকরা বাক্সের কাচের মধ্য দিয়ে ভেতরের ছবি দেখত। একজন ব্যক্তি ছবি ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে সুর করে বর্ণনা করত সব গল্প-কাহিনী যাকে ‘বায়োস্কোপওয়ালা’ বা ‘বায়োস্কোপি’ বলা হতো। এতে সাধারণত স্থির ছবি বা হাতে আঁকা স্লাইড দেখানো হতো। কিন্তু ভারতে আরেক ধরনের বায়োস্কোপের প্রচলন ছিল। সেটাও ছিল টিনের বায়োস্কোপের মতোই, তবে অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে গ্রামোফোন ও পরে রেকর্ড বা ক্যাসেট প্লেয়ারের সংযোগ থাকত, যাতে চলমান ছবির সঙ্গে সংগীত মিলত।
উপমহাদেশর টিনের বায়োস্কোপ মূলত ১৫ থেকে ১৭ শতকের ইউরোপীয় ‘পীপ-শো’ (peep show) বা ‘ওন্ডারবক্স’-এর একটি সরলীকৃত ও স্থানীয় কারিগরদের তৈরি সংস্করণ, যা লোকসংস্কৃতিতে মিশে গিয়ে এক অনন্য রূপ ধারণ করে। ম্যাজিক লণ্ঠন এবং পীপ-শো-এর মতো যন্ত্রগুলোকেই আধুনিক বায়োস্কোপ ও সিনেমার পূর্বসূরি হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিলুপ্তির পথে: আধুনিকতার ঝলকে হারানো আলো
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্টেছে বিশ্ব। টিভি, রেডিও, রূপালি পর্দা, ডিভিডি, স্মার্টফোন, ইউটিউব—সব মিলিয়ে বায়োস্কোপকে বিদায় নিতে হলো। হারিয়ে গেল সেই সুর, প্যাডেল ঘোরানোর শব্দ, আর কাচে চোখ রাখার উৎকণ্ঠা। আধুনিক সিনেমা, বিশেষ করে সবাক চলচ্চিত্র বা ‘টকি’-র আবির্ভাবের ফলে বায়োস্কোপের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে যায়। ১৯২০-এর দশকে যখন সিনেমা হল এবং টেলিভিশন জনপ্রিয় হতে শুরু করল, তখন ভ্রাম্যমাণ বায়োস্কোপ তার আবেদন হারাতে থাকল। তবু ইতিহাস বলে, ৭১-এর যুদ্ধের গল্পও এক সময় বায়োস্কোপের মাধ্যমেই ছড়িয়েছিল গণমানুষের মাঝে। ১২৫ বছরের এ দীর্ঘ পথচলায় বায়োস্কোপ আজ শুধুই এক স্মৃতি। তবু স্মৃতির রাজ্যে তার দাপট আজও অমলিন।
শেষ আলো: মেলার মাঠে শেষ রোদ্দুর
যদিও এখন বিরল, তবু গ্রামীণ মেলাগুলোয় কখনো কখনো দেখা মেলে বায়োস্কোপের— মানুষ থমকে দাঁড়ায়, শিশুরা দৌড়ে আসে, আর কাচের ওপারে আবার জেগে ওঠে ছায়া-আলোর রূপকথা। কখনো কখনো এ আধুনিকতায় মোড়া প্রযুক্তির শহরেও ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে দেখা মেলে বায়োস্কোপের। এ অল্প কিছু প্রদর্শনী যেন স্মৃতি আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শেষ আলো জ্বালিয়ে রাখে— যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানে, সিনেমা জন্মেছিল একটি ছোট্ট টিনের বাক্সে, আর গল্প বলার মধ্য দিয়ে।













