সর্বশেষ

মিথ্যা অপহরণের নাটক সাজিয়ে হোটেল মালিকের আত্মগোপন, অবশেষে চার বছর পর উদ্ধার ও রহস্য উদঘাটন

এম জাফরান হারুন

গত ২০২২ সালে বরগুনা জেলার তালতলী থানাধীন তালতলী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে হোটেল ব্যবসায়ী কথিত নিখোঁজের ঘটনায় প্রথমে পটুয়াখালী সদর থানায় নিখোঁজের জিডি করে পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালতে সাজানো অপহরনের মামলা দায়ের করে ভিকটিম আঃ মান্নান প্যাদার ছেলে মোঃ জসিম প্যাদা।

পটুয়াখালী জেলা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার একাধিক টিম দীর্ঘ অনুসন্ধান করে এবং মামলার ভিকটিম আঃ মান্নান প্যাদাকে উদ্ধারের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে ভিকটিমের অবস্থান সনাক্ত করে।

এরই ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালী জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি চৌকস টিম অভিযান পরিচালনা করে বুধবার (১৬-০৯-২০২৬) দিবাগত রাত ০১.০০ ঘটিকার সময় ভিকটিম আঃ মান্নান প্যাদা (৭০) কে অবশেষে মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানা এলাকা হতে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তার বাড়ি বল্লভ, ইটবাড়িয়া, থানা ও জেলা- পটুয়াখালী।

ভিকটিম আঃ মন্নান প্যাদাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তিনি গত ২০২০ সালে বরগুনা জেলার তালতলী থানাধীন জয়ালভাঙ্গা এলাকায় তালতলী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে পটুয়াখালী হোটেল নামে ভাতের হোটেলের ব্যবসা করেন। তার উক্ত হোটেলে তাপ বিদ্যুত নির্মাণ কাজের দুইটি কোম্পানীর শ্রমিকরা মাসিক খাবার খাইতো। শ্রমিকের খাবারের টাকা কোম্পানীর মালিকরা মাস শেষে পরিশোধ করতো। তিনিও বিভিন্ন দোকান থেকে বাকিতে মালামাল ক্রয় করতো আবার পরে পরিশোধ করতো। হোটেল মালিক আঃ মান্নান প্যাদা একটি কোম্পানীর শ্রমিকদের কাছে পাঁচ লক্ষ ত্রিশ হাজার এবং অন্য আরেকটি কোম্পানীর শ্রমিকদের কাছে ছয় লক্ষ সত্তর হাজার টাকার মতো পাওয়ানা থাকে। হোটেল মালিক আঃ মান্নান প্যাদা আত্মগোপনে যাবার আগের দিন রাতে অনুমান ১০.৩০ ঘটিকার সময় পাওনা টাকার জন্য প্রথম কোম্পানীর মালিকের বাসায় গেলে সে তাকে চার লক্ষ টাকা দেয়। টাকা পেয়ে তিনি ঐ রাতেই তার কাছে পাওনাদার মুদি, মুরগি এবং মাছ ব্যবসায়ীদের কিছু টাকা দেন। বাকি টাকা তার কাছে থাকে। পাওনাদারদের কিছু টাকা দেবার পরেও বাকি টাকা পরিশোধ করতে বলে। হোটেল মালিক বাকি টাকা কিছুদিন পরে দেবার কথা বলে।

এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটকাটি হয়। পরে ম্যানেজার মোঃ নুর আলম সিকদার কিছুদিন পরে সে নিজে পাওনাদারদের বাকি টাকা পরিশোধ করবে বলে জানায়। পাওনাদারদের সাথে কথা বলে পার্শ্ববর্তী রাস্তায় উঠলে অন্য কোম্পানীর ম্যানেজারের সাথে দেখা হয়। তখন হোটেল মালিক কোম্পানীর ম্যানেজারের কাছে তার পাওনা টাকা চায়। তখন কোম্পানীর ম্যানেজার হোটেল মালিককে জানায় তাদের কাছে পাওনা টাকার মধ্যে কিছু টাকা হোটেল ম্যানেজার মোঃ নুর আলম সিকদারের কাছে দিয়েছে এবং বাকি টাকা কিছুদিন পরে দিয়ে দিবে। হোটেল ম্যানেজার মোঃ নুর আলম সিকদারের কাছে যে টাকা দিছে সে টাকা সম্পর্কে হোটেল মালিককে কিছু জানায়নি।

ওবায়দুল কাদের সাদ্দামকে বলেছিলেন, ‘মারো’: চিফ প্রসিকিউটর

এরপর হোটেল ম্যানেজার নুর আলম হোটেল মালিক আঃ মন্নানকে কিছুদিন আত্মগোপনে থাকতে বলে। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ম্যানেজার নুর আলম দেখে রাখবে এবং তার সাথে ম্যানেজার ফোনে যোগাযোগ রাখবে বলে জানায়।

এক পর্যায় হোটেল ম্যানেজার নুর আলম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে হোটেল মালিক আঃ মান্নান প্যাদা অপহরণের নাটক শুরু করে এবং প্রথমে পটুয়াখালী থানায় জিডি করে এবং পরবর্তীতে ইং-১৪-০৮-২০২২ তারিখ বিজ্ঞ আদালতে পাওনাদারের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৩৬৪/৩৬৫/১০৯ ধারায় সিআর মামলা দায়ের করে।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অপহরনের নাটক সাজানোর জন্য ম্যানেজার নুর আলমের কথা মতো তিনি প্রথমে তালতলী হতে বাসে পটুয়াখালী আসেন। পটুয়াখালী থেকে বাস যোগে ঢাকায় যান। ঢাকা থেকে ট্রেনে করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়ার কেবলা বাবার মাজারে যান। সেখানে কিছুদিন থাকার পর কুমিল্লার বেলতলা সলেমান ল্যাংটা বাবার মাজারে যান। দীর্ঘদিন সেখানে থাকার পর চট্টগ্রাম মাইজভান্ডারে যান। চট্টগ্রাম মাইজভান্ডারে কিছুদিন থাকার পর সেখান থেকে আবার ঢাকায় চলে আসেন এবং মিরপুর ১২নং উজারাঘাটে এক বাড়িতে দারোয়ানের চাকুরী নেন। কিছুদিন সেখানে দারোয়ানের চাকুরী করার পর চাকুরী ছেড়ে যশোর জেলার বড়োবাজার গাজী কালুর মাজারে গিয়ে থাকেন। যশোর থেকে বাগেরহাট খানজাহান আলীর মাজারে যায় এবং সেখানে দীর্ঘদিন থাকার পর সেখান থেকে বাকেরগঞ্জের বারো আউলিয়ার মাজারে যান।

এভাবে বিভিন্ন মাজারে মাজারে ও বেদে পল্লীতে ছদ্দবেশে আত্মগোপনে প্রায় সাড়ে চার বছর কাটিয়ে দেয়। সবশেষে বাগেরহাট মাজারে পরিচয় হওয়া কাজল নামে ধর্মের মেয়ের বাসা বরিশালে যান। পরে বরিশালে তার ধর্মের মেয়ের বাসা হতে মাদারীপুর তার ভগ্নিপতির বাড়িতে যান। এরই মধ্যে তার ছেলেকে দিয়ে তার কাছে পাওনাদারদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দিয়ে তাদের বিভিন্ন ভাবে হয়রানী করেন। মামলা হবার পরে ছদ্দবেশ ধারন করিয়া ভিকটিম আঃ মান্নান প্যাদার অবস্থান সনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়।

এদিকে ভিকটিম আঃ মান্নান প্যাদাকে উদ্ধার করার জন্য পুলিশের একটি চৌকস টিম লেগে থাকে। একপর্যায় এই দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর পুলিশের চৌকস টিম আত্মগোপনে থাকা আঃ মন্নান প্যাদার অবস্থান সনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

কাবিননামায় আগের বিয়ে ও সন্তানের তথ্য বাধ্যতামূলক চেয়ে রিট

তবপ আঃ মন্নান প্যাদাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দেনার টাকা পরিশোধ করতে না পেরে পাওনাদারদের ফাঁসানোর জন্য এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানায়। উদ্ধারকৃত আঃ মান্নান প্যাদাকে বিজ্ঞ আদালতে উপস্থাপন করলে তিনি বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত চলমান রয়েছে এবং এ ঘটনার সাথে যেসকল ব্যক্তি বা সহায়তাকারী জড়িত আছে তা নিরূপণে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহ যে বা যারাই এই অপরাধে জড়িত থাকুক না কেন, তাদেরকে চিহ্নিত করে গ্রেফতারপূর্বক আইনের আওতায় আনার জন্য জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে পটুয়াখালী জেলা পুলিশ জানিয়েছেন। (১৭/০৯/২০২৬)

ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT

দৈনিক আমাদের খবর একটি বাংলা ভাষার অনলাইন সংবাদমাধ্যম। দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদ ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নির্ভুলতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

×

নিউজ কার্ড প্রিভিউ (HTML Version)

News Image
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Trulli

মিথ্যা অপহরণের নাটক সাজিয়ে হোটেল মালিকের আত্মগোপন, অবশেষে চার বছর পর উদ্ধার ও রহস্য উদঘাটন