আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের সময় শুধু আয়, সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন করদাতার সারা বছরের জীবনযাত্রায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তারও বিস্তারিত হিসাব দিতে হয়। পরিবারের ভরণপোষণ থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, গাড়ির খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা, ভ্রমণ ও উৎসবসহ বিভিন্ন ব্যয়ের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করার প্রয়োজন হতে পারে।কর কর্মকর্তারা এসব তথ্যের মাধ্যমে একজন করদাতার ঘোষিত আয় ও তার জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করতে পারেন। এ কারণে রিটার্ন দাখিলের আগে পুরো বছরের ব্যয়ের হিসাব গুছিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের ভরণপোষণ
পরিবারের দৈনন্দিন খরচ, বাজারসদাই এবং পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণে সারা বছরে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা হিসাবের মধ্যে রাখতে হয়। এখানে মাসভিত্তিক নয়, পুরো বছরের মোট ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বাসাভাড়া ও বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ
বছরজুড়ে বাসাভাড়া বাবদ কত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তার পাশাপাশি বাড়ি বা বাসার রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা অর্থের হিসাবও সংরক্ষণ করতে হয়। এসব ব্যয় করদাতার আয় ও জীবনযাত্রার সামগ্রিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হতে পারে।
গাড়ি ও যানবাহনের খরচ
ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো যানবাহন থাকলে সেটি পরিচালনায় সারা বছরে কত টাকা খরচ হয়েছে, সেই হিসাবও দিতে হয়। জ্বালানি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন ফি বা মাশুল এবং চালকের বেতন—সব ধরনের সংশ্লিষ্ট ব্যয় এই খাতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যয়
বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন, মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট বিলও জীবনযাত্রার নিয়মিত ব্যয়ের অংশ। তাই এসব খাতে বছরজুড়ে পরিশোধ করা অর্থের হিসাব রাখা প্রয়োজন।
সন্তানদের শিক্ষার খরচ
সন্তানদের স্কুল-কলেজের বেতন, টিউশন ফি, কোচিংসহ শিক্ষার পেছনে হওয়া বিভিন্ন ব্যয়ের তথ্যও সংরক্ষণ করতে হয়। কোনো করদাতার ঘোষিত আয়ের তুলনায় শিক্ষাব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখা গেলে সেই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই এসব খরচের রসিদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যত্ন করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
দেশ-বিদেশে ভ্রমণ
দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশে ভ্রমণের জন্য সারা বছরে যে অর্থ খরচ হয়েছে, তার হিসাবও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণীতে রাখতে হয়। ভ্রমণের খরচ ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের রেকর্ড সংরক্ষণ করা উচিত।
উৎসবের ব্যয়
ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব উপলক্ষে কেনাকাটা, পোশাক, বাজারসদাই এবং স্ত্রী-সন্তান বা আত্মীয়স্বজনের জন্য করা খরচও হিসাবের মধ্যে রাখতে হয়। কাউকে নগদ অর্থ বা উপহার দেওয়ার মতো ব্যয় হয়ে থাকলেও সেটিও বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে।
উৎসে কর্তিত কর ও অন্যান্য কর
বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খাতে যে উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছে, তার তথ্যও দিতে হয়। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর্তিত কর এবং আগের বছরের রিটার্নের ভিত্তিতে পরিশোধ করা আয়কর ও সারচার্জের তথ্য সংরক্ষণ করতে হয়।
ঋণের সুদ
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনো উৎস থেকে ঋণ নেওয়া থাকলে সেই ঋণের বিপরীতে বছরে কত টাকা সুদ পরিশোধ করা হয়েছে, তার হিসাবও জীবনযাত্রার ব্যয়ের অংশ হিসেবে উল্লেখ করতে হয়।
আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
জীবনযাত্রার ব্যয়ের এসব তথ্যের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো করদাতার ঘোষিত আয় এবং বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা। একজন ব্যক্তি যে পরিমাণ আয় দেখিয়েছেন, তার তুলনায় তার জীবনযাত্রার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেশি কি না—এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর কর্মকর্তারা তা পর্যালোচনা করতে পারেন।
তাই আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের সময় পুরো বছরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা জরুরি। এতে সঠিক তথ্য দিয়ে রিটার্ন প্রস্তুত করা যেমন সহজ হয়, তেমনি আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়।











